
আমি কাজী খাদিজা ইয়াসমিন। জন্ম হয় আমার যশোর সদরে। ১৯৮৮ সালের ১৫ ই জুন সোনার চামচ মুখে নিয়েই আমার জন্ম হয়েছিল। আট ভাই -বোনের সবার ছোট আমি। বাবা জাতিসংঘে চাকরি করতেন, মা ছিলেন গৃহিণী। আমাকে জন্ম দিয়েই আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই সুবাদে মানুষ হই, আমি ভাই -বোনদের কাছে। সবাই আমাকে খুব ভালোবাসতো।বাকি সাত ভাই বোন একেকজন একেক নামে ডাকতো আমাকে। অবশেষে আমার নাম রাখা হলো আকিকা করে। কিন্তু তারপরেও যার যেটা খুশি সেটাই বলে আমাকে ডাকতো। ছোটবেলা থেকেই আমি পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম। সেজন্য আমাকে ভর্তি করা হলো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। তারপরে ক্লাস থ্রিতে আমি যশোরের নাম করা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় দিয়ে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে ভর্তি হলাম। যশোর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে, মেধা তালিকা থাকায় পরিবারের সবাই খুব খুশি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত দুঃখ কি জিনিস এটা আমি জানতামই না।ছবি আঁকা, আবৃতি, রচনা প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতায় আমি অনেক পুরুস্কার পেয়েছি। আমার বাবার ইচ্ছে ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবে। সেই সুবাদে নবম শ্রেণী থেকে আমি বিজ্ঞান বিভাগে পড়া শুরু করলাম। ছোট বেলা থেকে আমার মানুষের উপকার করার ইচ্ছে ছিল। হবে না কেন, মা - বাবা কে দেখতাম অসহায় কোন মানুষকে খালি হাতে ফেরত দিতেন না। যা হোক আমার টিফিনে প্রায় প্রতিদিন চল্লিশ -পঞ্চাশ টাকা হয়ে যেত।পাশে আমার এক বান্ধবী টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে পারছিল না। আমি মাকে বলে আমার টিফিনের টাকা থেকে ওর খাতা কলম কিনে দিতাম।মা আমাকে সাপোর্ট করতো। বাবা শেখা তো দেশ প্রেম সম্পর্কে। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। দেশকে ভালবেসে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ৬ মাসের ছুটিতে বাড়ি আসেন। ৩ ভাইয়ের পরে আমার বড় বোনের জন্ম হয়, ১৯৭১সালের ২রা এপ্রিল। আমার বাবা যুদ্ধে যান ১০ এপ্রিল, তারপর থেকে তার আর কোন খোঁজ ছিল না সবাই ভেবেছিলো তিনি মারা গেছেন কিন্তু যুদ্ধের ২মাস পর তিনি আহত হয়ে ফিরে আসেন এবং যুদ্ধের শেষের দিকে তার পায়ে গুলি লাগার কারণে তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। যাহ হোক এবার আমার গল্পে ফেরত আসি, দশম শ্রেণি থেকে হঠাৎ কালবৈশাখীর ঘনঘটা মেঘের ছায়া আমার জীবনে এসে পড়ে। আমার নোয়া ভাই ব্যাবসা করতে গিয়ে প্রায় ৮০লাখ টাকার মতো লস খান তারপর পাওনা দারের টাকা দিতে গিয়ে আমার বাবা জমি বিক্রয় করতে বাধ্য হন। তারপরও পাওনাদারের টাকা মেটাতে সক্ষম হয় না এবং নেমে আসে আমাদের পরিবারে দুঃখের ছায়া। পারিবারিক বিভিন্ন ঝামেলার কারণে পড়াশোনা ঠিকঠাক মন বসাতে পারতাম না।টেস্টের রেজাল্ট তেমন একটা ভালো হলো না। বান্ধবীরা সবাই ঠাট্টা করতে শুরু করলো। পারিবারিক সমস্যার কারণে আমি আস্তে আস্তে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পরি।এ সময়ে প্রায় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম। আমাকে ডক্টর দেখানো হলো। ডাক্তার বললো আমাকে পারিবারিক সমস্যার থেকে দূরে রাখতে। কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না। মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে আমার জীবন থেকে দেড় বছর হারিয়ে গেল। এই দেড় বছর কি হয়েছে আমার সাথে আমি জানি না। যখন আমার জ্ঞান ফিরল তখন আমি আমার নানা বাড়ি মায়ের সাথে।মায়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম মানসিক রোগী হওয়ায় আমাকে স্কুল থেকে এস,এস,সি পরীক্ষা দিতে দেয় নি



।আমার জীবনের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। তখন আমার মনে হতো, আমি কেন সুস্থ হলাম? তখন আমি আমার নানা বাড়ির পাশে একটি মেয়ে কে দেখলাম তার দুটো পা নেই, তার পরে ও সে স্কুলে যাচ্ছে। আমি মা কে বললাম,আবার পড়াশোনা করতে চাই। মা আমার খুশির জন্য আমাকে নিয়ে যশোরে ফিরলো।কিন্তু যশোরে আমার পরিচিত সবাই আমাকে পাগল বলে ডাকতে শুরু করলো।আমাকে স্কুলে ভর্তি করতে চাইল না। আমি পাগল বলে।তখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে করতো।আমার মানসিক অবস্থা আবার খারাপ হচ্ছে দেখে। আমার মা -বাবা আমাকে বড় বোনের বাড়ি পাঠিয়ে দিল কিন্তু সেখানে ও আমি শান্তি তে থাকতে পারলাম না। তারপর সম্পূর্ণ অপরিচিত এলাকা নিয়ে আমাকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এস,এস,সি প্রোগ্রামে ভর্তি করে দিল। আমি জিপিএ ৪.১৫ মানবিক বিভাগে পাশ করলাম।